আর্কাইভস ও নথি ব্যবস্থাপনা

Normal
0

 

     আর্কাইভস ও নথি ব্যবস্থাপনা

মীর সাহেব

 

Image 

যে কোন দেশের অতীতের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভেৌগলিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সহ সকল প্রকার কর্মকান্ডের নিদর্শন ও দালিলিক প্রমান পাওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হলো লিখিত নথিপত্র ও দলিল দস্তাবেজ। একটি দেশ ও জাতি কতটুকু উন্নত সেটি তাদের আর্কাইভস বা সংর

ক্ষিত নথিপত্র হতে বোঝা যায়। নথিপত্র ও আর্কাইভস এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলা হয় – Archives is the memory of a Nations and tools of administration.

কোন দেশের আর্কাইভসের প্রশাসনের দুটি দিক আছে। প্রথমত: নথি ব্যবস্থাপনা যা নথি সৃষ্টির কালকে, তার রক্ষনাবেক্ষন এবং অপ্রচলিত নথি সমূহের সঠিক মূল্যায়ন, অপসারণ, বিনষ্টিকরণ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত: ঐতিহাসিক গুনসম্পন্ন নথিপত্র আর্কাইভসে স্থানান্তরিত হলে তা আর্কাইভস ব্যবস্থাপনার আওতায় পড়ে। তখন থেকে একজন আর্কিভিস্টকে সেগুলোর মেরামত, বাঁধাই, সংরক্ষণ এবং অন্যান্য গবেষকদের ব্যবহারের জন্য শ্রেনীকরণ, বর্ণনা ও তালিকা প্রস্তুত করে তথ্য সরবরাহ করতে হয়।

 

নথি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে প্রথমেই আমাদের জানা দরকার নথি বা রেকর্ড কি?

ইংরেজী রেকর্ড শব্দটি ল্যাটিন শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ মনে মানুষ স্বাভাবিকভাবে সবকিছু মনে রাখতে পারে না, তাই ভবিষ্যতের প্রয়োজনের উদ্দেশ্যে লিখে রাখে। রেকর্ড বলতে বই, পান্ডুলিপি, ম্যাপ, ফটোগ্রাফস যেমন-ক্যাসেট, মাইক্রোফিল্ম, রেডিও, স্লাইড, টেপ, ডাইস ইত্যাদিসহ Èইলেকট্রোনিকস’ রেকর্ডস যেমন- ডিস্ক সিডি, ডিভিডি, ম্যাগনেটিক টেপ ও রেকর্ডস ইত্যাদিকে বুঝায়।

 

নথি সৃষ্টি ও ব্যবহার

যে কোন নির্দষ্টি কারণে ও প্রয়োজনে  সরকারি/আধাসরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের কার্য পরিচালনার মাধ্যমেই নথি সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন সংস্থার কার্যসম্পাদনের মাধ্যমেই ধারাবাহিক ভাবে নথির সংখ্যা বাড়তে থাকে। এজন্য সুষ্ঠুভাবে কার্যসম্পাদন ও ভবিষ্যত প্রয়োজনের কারণেই নথির ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। 

সাধারণত নথিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয।

ক) চলতি নথি (Current Record)

খ) অর্ধচলতি নথি (Semi Current Record)

গ) অপ্রচলিত নথি  (Non Current Record)

 

ক. চলতি নথি (Current Record)

          নথির সৃষ্টিকাল থেকে যতদিন পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রয়োজন থাকে সে সকল নথিকে চলতি নথি বলে।  নথি সৃষ্টিকারী সংস্থা শৃঙ্খলা মত যথাস্থানে সাজিয়ে রাখবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নথিতে ভালো কাগজ ও কালি ব্যবহার করা প্রয়োজন।

 

খ) অর্ধচলতি নথি (Semi Current Record)

          যে সব নথি দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে সব সময় প্রয়োজন হয় না কিন্তু মাঝে মাঝে প্রয়োজন হয় তাকে অর্ধচলিত নথি বলা হয়। এই সমস্ত অর্ধচলতি নথি অফিস কক্ষে না রেখে প্রত্যেক অফিস বা সংস্থার রেকর্ডরুমে রাখা প্রয়োজন। এ সময় ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদি হতে পারে। অর্ধচলতি নথিকে প্রাথমিকভাবে যে মূল্যায়ন করে অপ্রয়োজনীয় নথিকে ধ্বংস করে ফেলতে হবে।

 

গ. অপ্রচলিত নথি (Non Current Record)

অপ্রচলিত নথি বলতে ওইসব নথিকে বুঝায় যেগুলো দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে প্রয়োজন হয় না কিন্তু গুরুত্ব ও মূল্যায়ন বিবেচনা করে সংরক্ষন করা হয়। অপ্রচলিত নথিকে অন্যান্য নথি থেকে সম্পূর্ণ পৃথক রাখা দরকার। ১২ বছরের অধিক পুরাতন নথি সৃষ্টিকারী সংস্থা সংস্থা ও জাতীয় আরকাইভসের সাহায্যে যেৌথভাবে মূল্যায়ন করে ওইগুলোকে গুরুত্ব অনুসারে  Èক’ Èখ’ ও Èগ’ শ্রেণীতে বিন্যাস করতে হবে। Èক’ শ্রেণীভুক্ত নথি অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। Èখ’ ও Èগ’ শ্রেণীভুক্ত নথি পুনর্মূল্যায়নের তারিখ দিয়ে রাখতে হবে। পর্যায়ক্রমে মূল্যায়নের পর আরকাইভস আইন অনুসারে ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে Èক’ ও Èখ’ শ্রেণীর নথি জাতীয় আরকাইভসে স্থায়ী সংরক্ষণের জন্য স্থানান্তর করতে হবে। জাতীয় আরকাইভসের অনুমোদন সাপেক্ষে ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে Èগ’ শ্রেণীর নথি ধ্বংস করা যেতে পারে।

 

নথি ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য

নথি স্ফীতই নথি ব্যবস্থাপনার জন্য উলে্লখযোগ্য কারণ।

১. প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান নথিগুলোকে অপ্রয়োজনীয় নথি থেকে পৃথক করা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। এতে অতিরিক্ত জায়গা বঁাচায় ও প্রয়োজনীয় নথি সহজেই হাতের কাছে পাওয়া যায়।

২. যদি নথিগুলোকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না যায় তবে একদিকে যেমন প্রয়োজনের সময় হাতের কাছে খুঁজে পাওয়া যাবে না তেমনি প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় নথি একসঙ্গে রাখলে প্রশাসনের কাজকর্মে জটিলতা সৃষ্টি হবে।

৩. অযথা নথি সৃষ্টি ও ডুপি্লকেট কপির নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

৪. প্রয়োজনীয় ও মূল্যবান নথিগুলোকে চিহ্নিত করে নিরাপদ জায়গায় সংরক্ষণ করা যায়।

৫. আরকাইভস রেকডসকে চিহ্নিত করে স্থায়ী সংরক্ষণের জন্য আরকাইভসে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়।

নথি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম

 

নথি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতগুলো পর্যায় রয়েছে। যেমন:

ক. যাচাই-বাছাই ও শ্রেণীকরণ।

নথি যাচাই-বাছাই করার সময়ই কার্যধারা অনুসারে নথিকে শ্রেণীকরণ করতে হবে। নথির বিষয়বস্তু এবং পুরো ফাইলটি বিশে্লষণ করে ভবিষ্যত্ প্রয়োজন সম্পর্কে তথ্য দিয়ে চূড়ান্ত সদ্ধিান্ত গ্রহণ করতে হবে। এটি দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মাধ্যমে রেকর্ডরুমে নথি পাঠানের পূর্বেই যাচাই-বাছাই করতে হবে।

 

খ. মূল্যায়ন

নথি ব্যবস্থাপনায় নথির মূল্যায়ণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অফিসকক্ষে নথি স্ফীতির তথ্যাবলী আহরণে অনেক প্রকার অসুবিধার সৃষ্টি হয়। সুতরাং নথির প্রয়োজন শেষ হওয়ার পর অবিলম্বে তার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। মূল্যায়নের সময় প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক উভয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নথি মূল্যায়ন করতে হবে। এ ব্যাপারে নথি সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠানের ও কোনো আর্কিভিস্টকে দায়িত্ব দিতে হবে।

 

গ. সময় নির্ধারণী তালিকা:

মূল্যায়নের পর যে ফাইলগুলো প্রয়োজনে আসবে না বা বর্তমান কর্মকাণ্ডে প্রয়োজন হবে না সেগুলো রেকর্ডরুমে রাখতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে সময় নির্ধারণ করে মূল্যবান নথি সম্পর্কে তালিকা তৈরি করে

 

 

রাখতে হবে। এই তালিকাকে Retention scheduled  বলা হয়। যে সকল নথি রেকর্ডরুমে বা আকাইভসে  সংরক্ষণের জন্য রাখা হবে সেগুলোতে Èস্থায়ী’ এবং তালিকার পাশে (টিক চিহ্ন) দিতে হবে। যে নথিগুলো ধ্বংস করা হবে সেগুলোতে ক্রস (x) চিহ্ন দিতে হবে। নথি মূল্যায়ন কারীদের অবশ্যই সংশি্লষ্ট সংস্থার প্রশাসনিক ইতিহাস ও কার্যাবলী সম্পর্কে জ্ঞান থাকতে হবে।

 

বিনষ্টিকরণ

নথি ব্যবস্থাপনার অপর আরেকটি কাজ হলো বিনষ্টিকরণ। অপ্রয়োজনীয় নথি সংরক্ষণ করার ফলে অর্থের অপচয় হয় এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং অপব্যবহার হয়। নথি বিনষ্ট করার আগে বিনষ্টিকরণ তালিকা তৈরি প্রয়োজন এবং এ ব্যাপারে আরকাইভসের অনুমোদন ছাড়া বিনষ্ট করা কোনোক্রমেই উচিত নয়।

 

নথি সংরক্ষণ পদ্ধতি

প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত কারণে একটি নির্দষ্টি সময়ের পর নথি নিজে থেকেই নষ্ট হতে থাকে। তাই নথিপত্র সংরক্ষণের জন্য নম্নিবর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে∏

১. পোকামাকড় থেকে রক্ষা করতে হবে।

২. রেকর্ডরুম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

৩. নথি উপযুক্ত মেরামতের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৪. নথিকে জীবাণুমুক্ত করতে ফিউমিগেশন করা।

৫. শীতাতপ রোধক কক্ষে নথি সংরক্ষন করা ও

৬. আর্দ্রতা রোধক কক্ষে নথি রাখতে হবে।

 

রেকর্ডরুম স্থাপন

প্রত্যেকটি সংস্থার নিজস্ব একটি রেকর্ডরুম থাকা প্রয়োজন। কারণ রেকর্ডরুম ছাড়া সুষ্ঠু নথি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। নথি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের সঙ্গে নম্নি পর্যায়ের কর্মচারী থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ জড়িত থাকা প্রয়োজন।

 

উপসংহার

বর্তমান যুগে সরকারি সকল সমুহের সংস্থার নথি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ও ক্ষমতা জাতীয় আরকাইভসকে দেওয়া হয়েছে। সংস্থাগুলোর নিজস্ব নথি ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে। বর্তমান কালে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই নথি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সে দেশের আরকাইভসের উপর ন্যস্ত।  বাংলাদেশ জাতীয় আরকাইভস আইন অনুসারে কোনো সরকারি অফিস তার নথিপত্র আরকাইভসের অনুমতি ছাড়া ধ্বংস করতে পারে না। কেবলমাত্র মূল্যহীন নথি ধ্বংস করতে পারে। সুতরাং দেশে সুষ্ঠু ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করার জন্যই নথি ব্যবস্থাপনা বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s